A country’s economy can not continue to stumble again

A country’s economy can not continue to stumble again

কোনো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে প্রথম দিককার চিন্তা-ভাবনায় একদল ফরাসি চিন্তাবিদ তাকে তুলনা করেছিলেন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে। ‘ফিজিওক্র্যাট’ নামে পরিচিত এ চিন্তাবিদদের মতে, মানবদেহের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোও সে রকম। সুস্বাস্থ্যের জন্য যেমন দরকার সব কয়টি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতাহীন সমন্বয়, যা প্রাকৃতিক নিয়মেই সম্পাদিত হয়ে থাকে, তেমনি একটি দেশের অর্থনৈতিক সুস্বাস্থ্যের জন্য দরকার কোনো রকম বাধা-বিপত্তি ছাড়া অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্ম সম্পাদনের সুযোগ। বর্তমানে বহুল প্রচলিত বাজার অর্থনীতির মূল তাত্ত্বিক ধারণাটির সঙ্গে ‘ফিজিওক্র্যাট’দের চিন্তা-ভাবনা সঙ্গতিপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বারবার নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। সেটা কখনো সক্ষমতা অর্জনের পথে বাধা আবার কখনো অর্জিত সক্ষমতা পূর্ণ প্রয়োগের পথে বাধা। এভাবে বারবার হোঁচট খেলে একটি দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। সুষ্ঠু শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপের জন্য যেমন দরকার বিভিন্ন উপাদানের, তেমনি অর্থনীতিরও দরকার নানা শক্তির। প্রবৃদ্ধির চাকার গতি নির্ভর করে এসব অর্জিত শক্তির ওপর। সে শক্তি অর্জনের জন্য দরকার বিনিয়োগ।

সরকারি খাতের বিনিয়োগ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করে। সুশাসন না থাকলেও আশির দশকে ভৌত অবকাঠামোর কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, যা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নেয়া বাজার উদারীকরণ নীতির সঙ্গে মিলে প্রবৃদ্ধির চাকায় গতি এনেছিল। সেজন্যই আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বেড়েছে, যা পরের দশকে আরো ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৬ শতাংশে আটকে আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির এখন দরকার নতুন শক্তির, নতুন নতুন অবকাঠামো এবং কলাকৌশল।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বারবার রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছে। কোনো মানবশরীর যদি বারবার বাহ্যিক আঘাতের সম্মুখীন হয়, তার যেমন শক্তি ক্ষয় হয়, তেমনি বারবার রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিরও একই অবস্থা হচ্ছে। দেশ-বিদেশের অনেক অর্থনীতিবিদ গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কী পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটা নিয়েও গবেষণা দরকার। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে গুণগত মান এবং তা অর্জন বা পুনরুদ্ধারের জন্য যে সহিংস লড়াই-সংগ্রামের পথ অনুসরণ করা হয়, অর্থনীতির ওপর তার সার্বিক প্রভাব কতটা সহায়তামূলক আর কতটা প্রতিবন্ধকতামূলক, সেটা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।

প্রবৃদ্ধির চাকা এখন যেভাবে ৬ শতাংশে এসে আটকে গেছে, গতিহীনতার এ অচলায়তন ভাঙতে হলে সবার আগে দরকার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন নতুন ভৌত অবকাঠামো তৈরি করা, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে প্রণোদনা তৈরি করবে। বর্তমানে বেশকিছু বড় ভৌত অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ দৃশ্যমান। কিন্তু তাদের বাস্তবায়নের গতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। তার ওপর নতুন করে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংঘাত এবং হানাহানি সঠিক সময়ে তাদের মানসম্পন্ন বাস্তবায়নকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা অর্থনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যেক নীরব ঘাতকের মতো সংকটাপন্ন করে তুলছে। নীরব বলছি এ কারণে— তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝা যায় না। যখন কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্ম থেমে যায়, তখন তার একটি ঋণাত্মক প্রভাবকে শুধু অঙ্কের হিসাবে বোঝা যায় না। বর্তমান সহিংসতাকে শুধু অঙ্কের হিসাবের মধ্যে রাখার মধ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রের এক নির্মম ঔদাসীন্য এবং দায়হীনতা লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার হাতবদলের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের গুণগত মানের সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। ক্ষমতা থেকে কাকে হটিয়ে কারা এল, তা দিয়ে এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসে না। কিন্তু ক্ষমতাবদলের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তার প্রধান বলি হয় সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ। আর এ সত্য অঙ্কের হিসাবে আসে না।

যাদের অনেক আছে, তারা কিছুদিন অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মে সংশ্লিষ্ট হতে না পারলেও হয়তো সংসারের দায় এবং অর্থনৈতিক বোঝা চালিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের কি সেই সক্ষমতা আছে? অথচ সংঘাতমূলক রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার প্রথম ও প্রধান বলি তারাই। এজন্যই হরতাল, অবরোধে কত ক্ষতি হলো, তার পাশাপাশি কার ক্ষতি হলো, কার ভাতের থালা শূন্য হলো, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়ায়, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এখন হরতাল ও অবরোধের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। পক্ষে-বিপক্ষে কত বাহারি যুক্তি, সবই আবার জনগণের ভোটের পাশাপাশি ভাতের অধিকারকে ঘিরে। কিন্তু যে সাদাসিধা বিষয়টি আসে না তা হলো, এসবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। এভাবে চললে গরিব আরো গরিব হবে, আর যারা দারিদ্র্য থেকে কিছুটা মুক্ত, তারা দরিদ্র হবে।

হরতাল বা অবরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত সহিংসতার প্রধান বলি কারা? এ-যাবত্ যে মানুষগুলো পুড়ে মরেছে কিংবা বিকলাঙ্গ হয়েছে, সে তালিকায় তো কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগীদার নেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিম্নতম স্তর— গ্রাম/ইউনিয়ন পর্যায়ের মেম্বার-চেয়ারম্যানরাও নেই। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারাও নেই। আছে কেবল খেটে খাওয়া দিনমজুর, বাস-ট্রাকের শ্রমিক, স্কুলগামী কিশোর-কিশোরী আর তাদের মায়েরা। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, এ কেমন আগুন যে ক্ষমতার ভাগীদারদের গায়ে লাগে না। কারা দেয় এ আগুন? যে আগুন বিত্তশালীদের গায়ে লাগে না, (কোনো আগুন দেয়াই সমর্থনযোগ্য নয়) কেবলি খেটে খাওয়া আর দুর্বল মানুষগুলোকে জ্বালিয়ে মারে, সে আগুন নেভানোর দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র ও সরকার ব্যর্থ হলে অর্থনীতির চাকা থেমে যাবে। ঘোড়া পুড়ে শুধু গাড়ি বাঁচিয়ে ঘোড়ার গাড়ি চালানো যায় না।

অর্থনৈতিক বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে অনিশ্চয়তা। হরতাল আর অবরোধ অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্ম স্থবির করে দেয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যত্ অনিশ্চয়তাকেও বাড়িয়ে তুলছে। আর এ কারণেই বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়ে আসবে। ফলে কমে আসবে প্রবৃদ্ধির হার। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে আসবে। আর দেশীয় পুঁজি পথ খুঁজে নেবে বিদেশে পালানোর। এভাবে বারবার হোঁচট খেয়ে একটি দেশের অর্থনীতি চলতে পারে না। এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায়ই নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়। আবার বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারণে সময়ে সময়ে বাইরের ধাক্কাও সামলাতে হয় তাকে। এত সব প্রতিকূলতার পর যদি আপন বলয় থেকে এত সব আঘাত আসে, তাহলে অর্থনীতি এগোবে কীভাবে?

 

লেখক: গবেষক, বিআইডিএস; সাবেক অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক; সাবেক শিক্ষক, উইলামেট বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রwww.bonikbarta.com

It's only fair to share...Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn